fbpx

মেরুদন্ডের পেছনের দিকের শেষ অংশে ব্যথা হলে সাধারণত তাকে কোমর ব্যথা বলে। অনেক সময় আমরা একে কিডনির কারনে ব্যথা বলে ভুল করি।

কোমর ব্যথার প্রতিরোধের ইউরোপীয় নির্দেশিকা অনুসারে, “কোমরের নিচের দিকে এবং নিম্নতর গ্লুটিয়াল ভাঁজের উপরে ব্যথা এবং অস্বস্তিই কোমর ব্যথা হিসেবে সংজ্ঞায়িত। এক্ষেত্রে পায়ে ব্যথা বা উপসর্গ থাকতে পারে, নাও পারে”।

আরেকটি সংজ্ঞা, এসকিনকেড অনুযায়ী, “কোমর ব্যথা নিম্ন পাঁজর ভাজ থেকে শুরু হয়ে পশ্চাতদেশে এবং উরুর শুরুর দিক থেকে মধ্যবর্তী অঞ্চলে হয়”।

কোমর ব্যথা যখন কাজ-কর্মের সাথে সম্পর্কযুক্ত তাকে মেক্যানিক্যাল কোমর ব্যথা বলে। প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার মধ্যে ৮৪ শতাংশ মানুষ জীবনকালের কোন না কোন সময় কোমর ব্যথায় ভোগেন। গবেষণায় ১১.৮ শতাংশ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত মধ্যবয়সীদের মধ্যে কোমর ব্যথার হার দেখা যায়। এছাড়া বিশ্বের কোমর ব্যথা রোগীদের ১১ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ কোমর ব্যথার কারণে শারিরিক ভাবে অক্ষম হয়ে থাকেন।

আপনি সঠিক নিয়মে এক্সারসাইজ করে আপনার কোমর ব্যথা প্রতিরোধ করতে পারেন। এছাড়া কাজে কর্মে সঠিক নিয়মে দেহবস্থান ধরে রেখে আপনি সহজেই কোমর ব্যথা প্রতিরোধ করতে পারেন।

কোমড় ব্যথার ফিজিওথেরাপি
কোমড় ব্যথার ফিজিওথেরাপি

কোমর ব্যথা প্রতিরোধে কিছু এক্সারসাইজ নিচে দেয়া হলোঃ

১. ব্রিজিং এক্সারসাইজঃ

ব্রিজিং এক্সারসাইজ একজন ব্যক্তির গ্লুটিয়াস ম্যাক্সিমাস বা পশ্চাতের বড় একটি পেশি গঠনে কাজ করে এবং কোমর ও নিতম্বের পেশির ও কাজ করে। এর ফলে পেছন থেকে আপনার মেরুদন্ডের শক্তি বৃদ্ধি পায়।

  • ক) বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে পড়ুন, দুই হাটু ভাজ করে বিছানা থেকে কোমর তুলুন যতক্ষণ না শরীর কাঁধ থেকে হাঁটু পর্যন্ত একটি সরল রেখা তৈরি করে।
  • খ) দই হাত ও পায়ের উপর ভর দিয়ে পেট উপরের দিকে ধরে রাখুন।
  • গ) তারপর কোমর মাটিতে নামিয়ে কয়েক সেকেন্ড বিশ্রাম নিন।
  • ঘ) ১৫ বার পুনরাবৃত্তি করুন এবং তারপরে ১ মিনিটের জন্য বিশ্রাম নিন। ১৫টি পুনরাবৃত্তির ৩ সেট করুন।

২. সিঙ্গেল লেগ ফ্লেকশনঃ

  • ক)বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে পড়ুন,এক পা সোজা রাখুন আর অন্য পা কাঁধ বরাবর হাটু ভাজ করে নিয়ে আসুন।
  • খ)উঠানো পা দু হাত দিয়ে চাপ দিয়ে ধরে রাখুন। আর অন্য পা সোজা করে রাখুন।
  • গ) পা নামিয়ে নিয়ে আসুন কয়েক সেকেন্ডের বিশ্রাম নিন।
  • ঘ)একই ভাবে আপনি অন্য পা কাঁধ বরাবর নিয়ে আসুন।
  • ঙ)১০ বার পুনরাবৃত্তি করুন এবং ১মিনিটের বিশ্রাম নিন। ১০ টি পুনরাবৃত্তির ২ সেট করুন।

৩.ডাবল লেগ ফ্রেকশনঃ

  • ক)প্রথমে আপনি বিছানায় শুয়ে পড়ুন। তারপরে আপনি দই হাটু ভাজ করে নাক বরাবর নিয়ে আসুন।
  • খ)দুই পা দুই হাত দিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রাখুন। অন্য দিকে আপনার কোমর যেন বিছানা থেকে একটু উঠানো থাকে।
  • গ) এই ভাবে ২ সেট করুন।আর তিন সেটে ১০ বার পুনরাবৃত্তি করুন। ১ মিনিটের বিশ্রাম করুন।

বিদ্রঃ যদি কারো ডিস্ক প্রোলাপ্স থাকে, মেরুদন্ডে ফ্র‍্যাকচার থাকে, বা এক্সারসাইজের পর কোমরে ব্যথা বেড়ে যায় বা পায়ের দিকে ব্যথা সহ সকল উপসর্গ চলে যায় তবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ এক্সারসাইজ করা যাবে না

৪. সিঙ্গেল লেগ ব্রিজিংঃ

  • ক) প্রথমে সোজা হয়ে শুয়ে পড়ুন। এক পা ভাজ করুন এবং বিছামায় নামিয়ে সমতাল করে রাখুন। অন্য পা সোজা করে উপরের দিক উঠিয়ে রাখুন।
  • খ)পিঠ হতে কোমর বরাবর সোজা উপরের উঠিয়ে রাখুন কয়েক সেকেন্ড।
  • গ)এই ভাবে অন্য পায়ের ক্ষেএেও করুন।
  • ঘ)৩ সেট করে করুন। ১৫ বার পুনরাবৃত্তি করুন এবং ১মিনিট করে বিশ্রাম করুন।

বিদ্রঃ খুব বেশি কোমর ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ এক্সারসাইজ করা যাবে না

৫.শ্রোণী কাতঃ

  • ক) প্রথমে সোজা হয়ে শুয়ে পড়ুন । আপনার দুই হাঁটু বাঁকা করুন এবং পা সমতল করে মেঝেতে শুয়ে থাকুন দুই হাত পাশে নামিয়ে রাখুন।
  • খ)মেজেতে তোয়ালে গোল করে ভাজ করে আস্তে আস্তে কোমর উঠা-নামা করুন এবং পেটে হালকা করে ধাক্কা দিন।
  • গ)৫ সেকেন্ড ধরে এভাবে করতে থাকুন তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুন।
  • ঘ)দৈনিক ১৫ বার করে ৩ সেট পুনরাবৃত্তির করুন এবং ১মিনিটের বিশ্রাম করুন।

৬. লাইং লেটারাল লেগ লিফটস্ঃ

  • ক) প্রথমে শুয়ে পড়ুন। তারপরে বাম দিক কাথ হয়ে শুয়ে বাম হাত মাথায় দিয়ে মাথা একটু উচু করে রাখুন।
  • খ)এক পা সোজা করে রাখুন। অন্য পা শূন্যে রেখে একপাশে শুয়ে থাকুন।
  • গ)সোজা এবং প্রসারিত রেখে উপরের পা টি প্রায় ১৮ ইঞ্চি উপরে তুলুন।
  • ঘ)২ সেকেন্ড এই ভাবে অবস্থান ধরে রাখুন। ১৫বার পুনরাবৃত্তি করুন। ১মিনিটের বিশ্রাম করুন।
  • ঙ)আবার, অন্য দিকে ঘুরুন এই ভাবে অপর পাশেও পা উত্তোলন করুন।প্রতিটি পাশে ৩ সেকেন্ড করে করুন।

৭.বিড়াল প্রসারিত ব্যায়ামঃ

বিড়ালের প্রসারিত ব্যায়াম কোমরের পেশি দীর্ঘ করে এবং এটিকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি পেশীগুলিতে স্পাজম কমাতে সহায়তা করতে পারে ও পাজরের অবস্থান ঠিক রাখতে সহায়তা করে।

  • ক)বাচ্চাদের মত ঘোড়া হবেন, দুই হাত সামান রেখা বরাবর মাথা বের করে দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকুন।
  • খ)পিছনে দুই পা হাটু বরাবর সমান রুপখায় রাখুন। পেট ভাজ করে মেরুদণ্ডের দিকে টানুন।
  • ঘ)আস্তে আস্তে পেশী সহজ করুন এবং পেটটি মেঝের দিকে হালকা ঝুলে পড়াতে দিন আবার টানুন। দিনে দুবার করুন। ৩ থেকে ৫ বার পুনরাবৃত্তি করুন।

বিদ্রঃ যদি কারো ডিস্ক প্রোলাপ্স থাকে, মেরুদন্ডে ফ্র‍্যাকচার থাকে, বা এক্সারসাইজের পর কোমরে ব্যথা বেড়ে যায় বা পায়ের দিকে ব্যথা সহ সকল উপসর্গ চলে যায় তবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ এক্সারসাইজ করা যাবে না।

৮.সুপারম্যান এক্সারসাইজঃ

একজন ব্যক্তির ভাল দেহবস্থান বজায় রাখার জন্য শক্তিশালী ব্যাক এক্সটেনসারের প্রয়োজন। এই ব্যায়ামের ফলে মেরুদণ্ডের উভয় পাশের পেশীগুলি শক্তিশালী ও কার্যকর হয়।

  • ক)মাটিতে বা বিছানায় কোমরে ভর করে শুয়ে থাকুন এবং উভয় হাত- পা প্রসারিত করুন।
  • খ)মেঝের মধ্যে প্রায় ৬ ইঞ্চির ব্যবধান তৈরি করুন এবং হাত-পা উভয়ই দিকে বাড়ান।
  • গ)পেট নাড়াচাড়া কারার চেষ্টা করুন।
  • ঘ) ঘাড়ের আঘাত এড়াতে মাথা সোজা রাখুন এবং মেঝের দিকে তাকান।হাত -পা যতদূর সম্ভব বাইরে প্রসারিত করুন।
  • ঙ) ২ সেকেন্ডের জন্য একই অবস্থান ধরে রাখুন। ১মিনিটের বিশ্রাম করুন। ১০ বার পুনরাবৃত্তি করুন। দৈনিক ৩ সেট করে করুন।

বিদ্রঃ খুব বেশি কোমর ব্যথা হলে এ এক্সারসাইজ করা যাবে না।

৯. সেরেট লোয়ার ব্যাক রোটেশনাল স্ট্রেচেসঃ

যারা ডেস্ক জব করেন তাদের জন্য এটি ভালো এক্সারসাইজ। বসে থাকা লোয়ার ব্যাক রোটেশনাল স্ট্রেচ কোমর ব্যথা উপশম করতে সাহায্য করে। এটি মেরুদন্ডের মূল পেশীতে কাজ করে এবং পিঠের নিচের অংশকে শক্তিশালী করে।

  • ক)একটি চেয়ারে বসুন পা মেঝেতে সমতল রাখুন।
  • খ)কোমর ডানদিকে মোচড়ান, পশ্চাৎ বাকা করে রাখুন এবং মেরুদণ্ড লম্বা রাখুন।
  • গ)মাথার পিছনে হাত রাখুন বা বাম ও ডান হাত দুটি আটকে রাখুন যাতে প্রসারিত হয়।
  • ঘ)১০ সেকেন্ডের জন্য অবস্থান ধরে রাখুন।
  • ঙ) আবার বিপরীত দিকে ব্যায়ামটি পুনরাবৃত্তি করুন।দিনে দুবার প্রতিটি দিকে ৩থেকে৫ বার পুনরাবৃত্তি করুন।

১০.পার্শিয়াল কার্লসঃ

পেটের শক্তিশালী পেশী মেরুদণ্ডকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এব পশ্চাৎকে সঠিক অবস্থানে রেখে কোর মাসল শিক্তিশালী করতে সহায়তা করে।

  • ক)মেঝেতে শুয়ে পড়ুন এবং হাঁটু বাঁকা করুন, পা সমতল রাখুন এবং পশ্চাৎ স্থির রেখে মাথার পিছনে দুই হাত একএে আটকে ধরে রাখুন।
  • গ)বুকের উপর ভর দিয়ে কিছুক্ষণ ধরে থাকুন।
  • ঘ)গভীরভাবে শ্বাস নিন।শ্বাস নেওয়ার সময়, পেটে টান দিয়ে পেটের পেশীগুলিকে সংযুক্ত করুন।
  • ঙ)ঘাড় মেরুদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মাটি থেকে আস্তে আস্তে মাথা এবং কাঁধ ২ ইঞ্চি উপরে তুলুন।
  • চ)৫ সেকেন্ড ধরে থাকুন তারপর শুরুর অবস্থানে ফিরে আসুন।অনুশীলনটি ১০বার পুনরাবৃত্তি করুন।৩ সেকেন্ড করে করুন।

বিদ্রঃ যদি কারো ডিস্ক প্রোলাপ্স থাকে, মেরুদন্ডে ফ্র‍্যাকচার থাকে, বা এক্সারসাইজের পর কোমরে ব্যথা বেড়ে যায় বা পায়ের দিকে ব্যথা সহ সকল উপসর্গ চলে যায় তবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ এক্সারসাইজ করা যাবে না।

কোমড় ব্যথার ফিজিওথেরাপির ছবি
কোমড় ব্যথার ফিজিওথেরাপি

কোমর ব্যথায় কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

কোমরের ব্যথার সবসময় একটি সুস্পষ্ট কারণ থাকে না এবং কোমর ব্যথার কারণ নির্নয় জরুরি। সঠিক পরামর্শ ও চিকিৎসা গ্রহণ করলে এটি প্রায়শই নিজের থেকে ভাল হয়ে যায়। বিশ্রাম নেওয়া, গরম বা ঠান্ডা থেরাপির চেষ্টা করা, ওটিসি ব্যথা উপশমকারী গ্রহণ এবং আস্তে আস্তে কাজের পুনরুদ্ধারের গতি বাড়িয়ে তোলা উচিৎ।
কোমরের নিচের ব্যথায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের যদি নিচের কোন উপসর্গ থাকে তাহলে তাদের অবিলম্বে চিকিৎসা নিতে হবে:

  • হাঁটতে বা পা নাড়াতে অসুবিধা
  • অন্ত্র বা মূত্রাশয়ের কার্যকারিতা হ্রাস বা পস্রাব পায়খানা বুঝতে বা ধরে রাখতে না পারা
  • পায়ে সংবেদন হ্রাস
  • খুব তীব্র ব্যথা
  • নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসায় ভাল না হওয়া
Dr. M Shahadat Hossain
Follow me

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This field is required.

This field is required.

14 + 11 =

Call Now