পিঠের ডান পাশে ব্যথা হওয়ার কারণ

পিঠের ডান পাশে ব্যথা হওয়ার কারণ. আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পিঠে ব্যথা হয়নি বা পিঠের ব্যথায় কষ্ট পাননি এমন লোক খুব কমই আছেন।  শুরুতে ব্যথাটি অল্পমাত্রায় শুরু হলেও যত দিন যায় ব্যথার মাত্রা তত বাড়তে থাকে এবং একসময় এমন একটি অবস্থা তৈরি হয় যে ব্যথার কারণে দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম ও চলাফেরা ও কষ্টকর হয়ে যায়। পিঠের ব্যথার ধরন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের হতে পারে, কখনো ব্যথাটি পুরো পিঠ জুড়েই হয়ে থাকে, কখনো শুধুমাত্র পিঠের মেরুদন্ডে হয় আবার কখনো পিঠের যেকোন এক পাশে ব্যথা হয়ে থাকে। কোমর ব্যথা বিভিন্ন কারণ ও তার প্রতিকার

পিঠের ডান পাশে ব্যথা হওয়ার কারণ

এটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্ভর করে কি কারণে ব্যথাটি হচ্ছে তার উপর। পিঠের কোন অংশে ব্যথা হচ্ছে সেটি চিহ্নিত করে চিকিৎসক রোগের সম্ভাব্য ধারণা দিতে পারেন। আজকের আলোচনায় আমরা জানবো পিঠের ডান পাশে ব্যথা হওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলো কি কি? তবে পিঠের ব্যথা যে অংশেই হোক কিংবা যে কারণেই হোক না কেন আমাদের অবশ্যই সঠিক রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে যাতে করে আমরা গুরুতর কোন ক্ষতির সম্মুখীন না হই। পিঠের বাম পাশে ব্যথা কেন হয়?

পিঠের গঠনপ্রণালী

পিঠের ডান পাশে ব্যথা হওয়ার কারণ

আমাদের পিঠ বা বক্ষস্থল হচ্ছে শরীরের একটি জটিল অঙ্গ। শরীরের এই অংশটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই বক্ষপিঞ্জরের ভিতরে হৃৎপিণ্ড ফুসফুসের মত জরুরি অঙ্গগুলোর অবস্থান। আমাদের এই পিঠ ঘাড়ের শেষ প্রান্ত থেকে শুরু হয় এবং এটি কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত।

হাড়ঃ আমাদের বক্ষপিঞ্জরের ঠিক মাঝখানে একটি শিরদারা থাকে এটাই মেরুদন্ড নামে পরিচিত।  মেরুদন্ডের পিঠের অংশে বারোটি কশেরুকা থাকে (T1-T12)। খসরুকা গুলো একের পর একসাথে পড়তে হয় বসানো থাকে এবং প্রতি দুইটি কশেরুকার মাঝে একটি করে ইন্টার ভার্টিব্রাল ডিস্ক থাকে যারা মেরুদন্ডের স্প্রিং হিসেবে কাজ করে অর্থাৎ ঝাকি শোষণ করে। এই কশেরুকা গুলোর সাথে পাঁজরের হাড় গুলো সংযুক্ত হয়ে বক্ষ পিঞ্জর গঠন করে।

মাংসপেশিঃ বক্ষপিঞ্জর এবং পিঠের মেরুদন্ড বেশকিছু মাংসপেশী দ্বারা আবৃত থাকে যেগুলো পিঠের নড়াচড়ায় সাহায্য করে। উল্লেখযোগ্য কিছু মাংসপেশী হচ্ছে ট্রাপিজিয়াস, রম্বয়েডস, ল্যাটিসিমাস ডরসি। ইরেক্টর স্পাইনা নামক পেশীটি পুরো মেরুদন্ড জুড়েই থাকে এবং এটি আমাদের সোজা হয়ে বসতে এবং দাড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে অর্থাৎ আমাদের মেরুদন্ডকে ধরে রাখে।

স্নায়ুসমূহঃ পিঠের স্পাইনাল কলামের মধ্য দিয়ে স্নায়ু রজ্জু মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে কোমরের নিচ পর্যন্ত চলে যায়। এ স্নায়ু রজ্জু থেকে প্রতিটি কশেরুকার পাশ দিয়ে স্পাইনাল নার্ভ বের হয়। এই স্পাইনাল নার্ভগুলো পিঠের গরম, ঠান্ডা ও ব্যথার অনুভুতি বহন করে এবং পিঠের বিভিন্ন ধরনের নরাচরায় সাহায্য করে।

উপরে বর্ণিত হাড়, মাংসপেশী এবং স্নায়ুসমূহ পিঠের দুই পাশে সমানভাবেই থাকে। তবে আমরা যারা ডানহাতি অর্থাৎ ডান হাতে কাজকর্ম করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করি তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় পিঠের ডান পাশ অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ব্যথা হতে পারে।

সচরাচর যে সকল কারণে পিঠের ডান পাশে ব্যথা হয় 

বিভিন্ন কারণে পিঠের ডান পাশে ব্যাথা হতে পারে। যদি সহজ ভাষায় বলি তাহলে পিঠের ডান পাশের রগে টান লাগা থেকে শুরু করে জটিলতর সমস্যা অর্থাৎ নার্ভ রিলেটেড সমস্যার কারণে পিঠের ডান পাশে ব্যথা হয়। সঠিক এবং পরিপূর্ণ চিকিৎসা নিমিত্তে আমাদের পাশে ব্যথা হবার  কারণ জানা অতীব জরুরী।

ওভারইউজ ইনজুরিঃ যেকোনো জিনিস মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কে ওভারইউজ বলা হয়। যেমন ধরুন একটি জামা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করলে সেটি এক সময় পাতলা হয়ে যায়, ফেসে যায় এবং পরিশেষে ছিড়ে যায়। ঠিক একইভাবেই আমাদের শরীরের যে কোন অঙ্গ হাত-পা কিংবা পিঠ এর দ্বারা একই ধরনের কাজ বার বার করতে থাকলে একসময় ওই অংশের মাংসপেশী দুর্বল হয়ে যায় এবং পেশীতে টান পড়ে অর্থাৎ ইঞ্জুরি হয়। বেশিরভাগই দেখা যায় আমরা যারা ভারী কাজকর্ম করি কিংবা যারা পেশাদার খেলোয়ার আছেন তাদের ক্ষেত্রে এই ওভার ইউজ ইনজুরি বেশি হয়।  যে সকল পেশাজীবীদের ভারী বস্তু তোলার কাজ করতে হয় যেমন রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্র, দিনমজুর ইত্যাদি ছাড়াও পেশাদার খেলোয়াড় যারা টেনিস, গলফ ইত্যাদি খেলার সাথে যুক্ত আছেন তাদের পিঠের ডান পাশ বেশি ব্যবহার হয়। যার পরিণতিতে পিঠের পাশে টান পড়তে পাড়ে এবং ব্যাথা হয়।

মেরুদন্ডের অসামঞ্জস্যতাঃ স্কোলিওসিস হলে পিঠের মেরুদন্ডের অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। মেরুদন্ড যে কোন এক পাশে বেঁকে যায় ফলে পিঠের দুই পাশে সমান ভর পরে না এবং এতে করে ব্যথা হতে পারে।

পাজরের হাড়জনিত সমস্যাঃ পিঠের মেরুদন্ডের সাথে পাঁজরের হারগুলো সংযুক্ত থাকে। পাঁজরের হাড় যদি ভেঙে যায় বা পাঁজরের হাড়ের সাথে যে তরুণঅস্থি থাকে সেগুলোতে যদি প্রদাহ হয় তাহলে ব্যথাটি পিঠে ছড়িয়ে যেতে পারে। 

অস্টিওআর্থ্রাইটিসঃ বয়স ৪০ পার হলে বা কিংবা প্রতিনিয়ত ভারী কাজকর্ম করলে পিঠের মেরুদন্ডের যথেষ্ট চাপ পড়ে।  এর ফলে মেরুদন্ডের ছোট ছোট জয়েন্টের মধ্যে টান পড়ে এবং ক্ষয় হতে থাকে যেটিকে আমরা অস্টিওআর্থ্রাইটিস নামে চিনি। মেরুদন্ডের এই  ফ্যাসেট জয়েন্টের অস্টিওআর্থ্রাইটিস হলে পিঠের ডান পাশে ব্যথা হতে পারে।

স্নায়ুজনিত কারণঃ পিঠের মেরুদন্ডের মাঝে একটি স্প্রিং এর মত অংশ থাকে যেটিকে আমরা ডিস্ক বলে থাকি। সেই ডিস্কে অতিরিক্ত চাপ পড়লে এটি থেকে জেল বের হয়ে পার্শ্ববর্তী রগে চাপ দেয়। এ সমস্যাটিকে ডিস্ক প্রোল্যাপ্স বলা হয়। ডিস্ক প্রোল্যাপ্স হলে সাধারণত পিঠে ব্যথা হয়, ব্যথাটি ছড়িয়ে যায় এবং ঝিন-ঝিন, ভাড়-ভাড়, অবশ-অবশ ও জ্বালাপোড়া হতে পাড়ে। যদিও এই সমস্যাটি পিঠের তুলনায় ঘাড়ে এবং কোমরে বেশি হয়। 

অস্বাস্থ্যকর ভংগিতে চলাফেরাঃ আমাদের মধ্যে অনেকেরই বসে থাকা কিংবা দাঁড়িয়ে থাকার ভংগি ভালো না অর্থাৎ স্বাস্থ্যসম্মত না। প্রায়ই দেখা যায় আমরা পেট ভাঁজ করে কুঁজো হয়ে বসি, দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায় দু পায়ে সমান ভড় দিয়ে না দাঁড়িয়ে একপাশে বেশি আর একপাশে কম ভড় দিয়ে দাড়াই। এতে করে মেরুদন্ডে চাপের তারতম্য ঘটে। ধীরে ধীরে পিঠের মাংসপেশীগুলো দুর্বল হয়ে যায়। এক সময় দেখা যায় পেশীগুলো পিঠকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। যার পরিণতিতে পিঠের মেরুদন্ডের স্নায়ুতে চাপ লাগতে পারে। পিঠে ডান পাশের স্নায়ুতে যদি চাপ লাগে তাহলে ব্যথাটি মেরুদন্ড থেকে পিঠের ডান দিকে ছড়াতে পাড়ে।

আলস্য জীবনঃ আমাদের সমাজে অনেকেই আছেন যাদের শারীরিক কার্যকলাপ নেই বলেই চলে।  তাদের বেশিরভাগ সময়টাই শুয়ে বসে কাটে। তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম এবং শুয়ে বসে সময় কাটানোর ফলে দিনে দিনে শরীরের ভার বহনকারী মাংসপেশিগুলো দুর্বল হয়ে যায়। এর ফলে পিঠের ডান পাশসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা হতে পারে।

পেশাগত কারণঃ আমরা দৈনন্দিন যে কাজটা করি অনেকেরই দেখা যায় কাজের ধরনের অনুযায়ী শরীরের ডানপাশের ব্যবহার বেশি। যেমন ধরুন যারা ভায়োলিন বাজাই, গিটারিস্ট অথবা যারা কম্পিউটারে কাজ করি তাদের ডান হাতে দীর্ঘ সময় মাউস ব্যবহার করতে হয়। এ সকল কারণে ও শরীরের ডান পাশে অতিরিক্ত চাপ পড়ে।  ফলে স্ট্রেইন বা স্প্রেইন হতে পাড়ে যা পিঠের ডান পাশের ব্যথার জন্য দায়ী।

ফুসফুস জনিত কারণঃ যেহেতু বক্ষ পিঞ্জরের ভিতরে ফুসফুস অবস্থিত সেহেতু ফুসফুসের ডানপাশের অংশে যদি নিউমোনিয়া হয় অথবা প্লুরাতে প্রদাহ হলে পিঠের ডান পাশে ব্যথা হতে পারে। 

কিডনিতে পাথরঃ কিডনিতে প্রদাহ হলে অথবা পাথর হলে ব্যথাটি কোমর থেকে শুরু হয়ে পিঠের দিকে আসতে পারে। যদিও এই সমস্যাটি খুব কমই দেখা যায়।

মাত্রাতিরিক্ত টেনশন করলেঃ অতিরিক্ত টেনশন করলে বা মানসিকভাবে চাপে থাকলে আমাদের শরীরের মাংসপেশিগুলো ও চাপে থাকে। এর ফলে পিঠের  মাংসপেশিগুলো টাইট হয়ে যায়  এবং স্পাজম হতে পারে। বিশেষ করে ঘাড় এবং  পিঠের মাংসপেশিগুলো বেশি টাইট হয়। এই টাইট হয়ে যাওয়া মাংসপেশীগুলো পিঠের ব্যথার কারণ হতে পারে এবং পিঠের যন্ত্রণা বাড়িয়ে দেয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা সমূহ

১। পিঠের ডান পাশে ব্যথা হবার সাধারণ কারণগুলো কি কি?

পিঠের মাংসপেশিতে টান পড়লে, স্কোলিওসিস বা পিঠের মেরুদন্ড বাঁকা থাকলে, পিঠে ডিস্ক প্রোল্যাপ্স হলে, পাজড়ের হাড় ভেঙে গেলে, আলস্য জীবন যাপন করলে এবং শরীরের ডান পাশ অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে পিঠের ডান পাশে ব্যথা হয়।

২। অতিরিক্ত মানসিক টেনশন করলে কি ডান পাশে ব্যাথা হতে পারে?

জ্বি, অতিরিক্ত মানসিক চাপে থাকলে বা দুশ্চিন্তা করলে ঘাড়ের এবং পিঠের মাংসপেশিগুলো টাইট হয়ে যায়। অর্থাৎ মাংসপেশিগুলো অনেক বেশি চাপে থাকে। ফলে পেশীতে স্পাজম হয়, পেশীগুলো টাইট হয়ে যায় এবং পরিণতিতে পিঠের ডান পাশে ব্যথা হয়। 

৩। কিভাবে বুঝব যে পিঠের ব্যথা মাংসপেশী জনিত কারণে হচ্ছে?

একই কাজ দীর্ঘদিন ধরে করার মাধ্যমে  পিঠের মাংসপেশীগুলো দুর্বল ও টাইট হয়ে যায়, পরিণতিতে সেখানে ওভার ইউজ ইনজুরি হয় এবং পিঠে ব্যথা হয়। মাংসপেশী জনিত ব্যথাগুলো সাধারণত একটি নির্দিষ্ট জায়গা জুড়ে হয় এবং মনে হয় যেন কেউ একজন ওই স্থানটিকে টেনে ধরে রেখেছে।

৪। শরীরের কোন সমস্যায় কি পিঠের ডান পাশে ব্যথা হতে পারে?

আমাদের নিউমোনিয়া হলে, কিডনিতে পাথর হলে এবং মেরুদন্ডের ডিস্ক প্রোল্যাপ্স হলেও পিঠের ডান পাশে ব্যথা হতে পারে। সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য আমাদের অবশ্যই একজন  বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত।

৫। পিঠের ডান পাশে হঠাৎ করে তীব্র ব্যথা হলে করণীয়?

যদি আপনার হঠাৎ করে পিঠের ডান পাশে প্রচন্ড ব্যথা হয় নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং জ্বর আসে হাত-পা অবশ হয়ে যায় তাহলে দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরণাপন্ন হউন।

তথ্যসূত্র

  1. Willard, F.H., Vleeming, A., Schuenke, M.D., Danneels, L. and Schleip, R., 2012. The thoracolumbar fascia: anatomy, function and clinical considerations. Journal of anatomy, 221(6), pp.507-536. https://onlinelibrary.wiley.com/doi/abs/10.1111/j.1469-7580.2012.01511.x
  2. Petersen, W., Rembitzki, I.V., Koppenburg, A.G., Ellermann, A., Liebau, C., Brüggemann, G.P. and Best, R., 2013. Treatment of acute ankle ligament injuries: a systematic review. Archives of orthopaedic and trauma surgery, 133, pp.1129-1141. https://link.springer.com/article/10.1007/s00402-013-1742-5
  3. Lis, A.M., Black, K.M., Korn, H. and Nordin, M., 2007. Association between sitting and occupational LBP. European spine journal, 16(2), pp.283-298. https://link.springer.com/article/10.1007/s00586-006-0143-7
  4. Gatchel, R.J., Peng, Y.B., Peters, M.L., Fuchs, P.N. and Turk, D.C., 2007. The biopsychosocial approach to chronic pain: scientific advances and future directions. Psychological bulletin, 133(4), p.581. https://psycnet.apa.org/record/2007-09203-002
Follow me
পরামর্শ নিতে 01877733322