fbpx

গলফারস এলবোকে মেডিকেলীয় ভাষায় বল মিডিয়াল এপিকন্ডাইলাইটিস, যেটি হল এক ধরনের টেন্ডিনাইটিস যা কনুইয়ের ভিতরের অংশকে প্রভাবিত করে। যেখানে কনুইয়ের ভিতরের হাড়ের অংশের সাথে হাতের পেশীর টেন্ডনগুলো সংযুক্ত অবস্থায় থাকে, সেখানেই এই কন্ডিশনের উপসর্গগুলো বিকশিত হয়।

টেন্ডনগুলো হাড়ের সাথে পেশী সংযুক্ত করে। আঘাত বা ইরিটেশনের কারণে, তারা ফুলে যেতে পারে এবং আক্রান্ত স্থানে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভুত হতে পারে। যদিও মিডিয়াল এপিকন্ডাইলাইটিসকে গলফারের কনুই হিসাবে উল্লেখ করা হয়, তবে এটি শুধুমাত্র গলফারদেরই হবে এমন না। এই কন্ডিশন টেনিস এবং বেসবল সহ বাহু বা কব্জির ক্রমাগত ব্যবহার জড়িত যেকোনো কার্যকলাপ থেকে ঘটতে পারে।

গলফারস এলবোর উপসর্গ:

গলফার এলবো কী ও এর প্রতিকার

মিডিয়াল এপিকন্ডাইলাইটিস হঠাৎ ঘটতে পারে বা এর উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে বিকশিত হতে পারে। লক্ষণগুলো হালকা থেকে গুরুতর পর্যন্ত হতে পারে। আপনার যদি গলফারস এলবো থাকে, তাহলে আপনি নিম্নলিখিত লক্ষণ ও উপসর্গের যে কোনো একটি অনুভব করতে পারেন:

– কনুইয়ের ভিতরে দিকে ব্যথা

– কনুই এ দৃঢ়তা অনুভব হওয়া

– হাত এবং কব্জিতে দুর্বলতা

– আঙ্গুলে, বিশেষ করে অনামিকা এবং কনিষ্ঠা আঙ্গুলের মধ্যে শিহরণ বা অসাড়তা

– কনুই নাড়াতে অসুবিধা ইত্যাদি

কনুইয়ের ব্যথা হাত থেকে কব্জি পর্যন্ত চলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। এটি দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপগুলো সম্পূর্ণ করা কঠিন করে তোলে, যেমন জিনিসপত্র তোলা, দরজা খোলা বা হ্যান্ডশেক করা ইত্যাদি। সাধারণত, আপনি স্বাভাবিক কাজকর্মের সময় যে হাত বেশি ব্যবহার করে থাকেন, মানে আপনার ডমিনেন্ট আর্ম যেটা, মিডিয়াল এপিকন্ডাইলাইটিস সেই হাতেই বেশি হয়ে থাকে।

মিডিয়াল এপিকন্ডাইলাইটিসের কারণ কী?

গলফার এলবো কী ও এর প্রতিকার

মিডিয়াল এপিকন্ডাইলাইটিস পুনরাবৃত্তিমূলক গতির কারণে হয়, এই কারণেই ক্রীড়াবিদদের মধ্যে এই কন্ডিশন দেখা দেয়। গলফাররা গলফ ক্লাবে বারবার হাত দুলানোর কারণে এই ধরনের টেন্ডিনাইটিস তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি টেনিস খেলোয়াড়রা টেনিস ব্যাট দোলানোর জন্য বারবার তাদের বাহু ব্যবহার করেন, যার কারণে এই কন্ডিশনের উপসর্গের বিকাশ হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই, বাহু এবং কব্জির অত্যধিক ব্যবহার টেন্ডনগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ব্যথা, পেশি দৃড়তা এবং দুর্বলতা শুরু করে।

গলফার এলবো কী ও এর প্রতিকার

এই ধরনের টেন্ডিনাইটিসের জন্য অন্যান্য ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বেসবল বা সফটবল খেলা, রোয়িং এবং ভারোত্তোলন। একটি যন্ত্র বাজানো এবং কম্পিউটারে টাইপ করার মতো পুনরাবৃত্তিক ক্রিয়াকলাপগুলোর কারণেও মিডিয়াল এপিকন্ডাইলাইটিস হতে পারে।

মিডিয়াল এপিকন্ডাইলাইটিস এর চিকিৎসা:

শুরুর দিকে ব্যথা, হাতের পেশি শক্ত হওয়া এবং দুর্বলতা অনুভব করার মতো উপসর্গের চিকিৎসা ঘরোয়া প্রতিকারের মাধ্যমে ঠিক করা সম্ভব।

* আপনার বাহুকে বিশ্রামে রাখুন

বারবার আক্রান্ত বাহু ব্যবহার করা নিরাময়কে দীর্ঘায়িত করতে পারে এবং আপনার  লক্ষণ ও উপসর্গগুলোর তীব্রতা আরও বেড়ে যেতে পারে। ব্যথা কমা না পর্যন্ত পুনরাবৃত্তিমূলক আন্দোলন জড়িত কার্যকলাপ বন্ধ করুন। একবার ব্যথা অদৃ চলে গেলে, নিজেকে পুনরায় আঘাত করা এড়াতে ধীরে ধীরে কার্যকলাপে ফিরে যান।

* ফোলা, ব্যথা এবং প্রদাহ কমাতে বরফ বা কোল্ড কমপ্রেস প্রয়োগ করুন

গলফার এলবো কী ও এর প্রতিকার

একটি তোয়ালেতে বরফ মুড়ে দিন এবং দিনে তিন বা চার বার বিশ মিনিট পর্যন্ত আপনার কনুইতে রাখুন।

* ওভার-দ্য-কাউন্টার (ওটিসি) ওষুধ গ্রহণ করুন

আইবুপ্রুফেন (অ্যাডভিল) এবং অ্যাসিটামিনোফেন (টাইলেনল) ফোলা এবং প্রদাহ কমাতে পারে। ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ খান। ব্যথার তীব্রতার উপর নির্ভর করে, আপনার ডাক্তার একটি স্টেরয়েড ইনজেকশন সুপারিশ করতে পারেন।

* স্ট্রেচিং ব্যায়াম করুন

গলফার এলবো কী ও এর প্রতিকার

আপনার টেন্ডন প্রসারিত এবং শক্তিশালী করার জন্য নিরাপদ ব্যায়াম সম্পর্কে আপনার ফিজিওথেরাপি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করুন। দুর্বলতা বা অসাড়তা থাকলে ফিজিওথেরাপি এবং অকুপেশনাল থেরাপির মাধ্যমে পুরোপুরিভাবে সুস্থতা অর্জন করা সম্ভব।

* একটি বন্ধনী পরুন

এটি টেন্ডিনাইটিস এবং পেশীর চাপ কমাতে পারে। আরেকটি বিকল্প হল আপনার কনুইয়ের চারপাশে একটি ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ মোড়ানো।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওটিসি ওষুধ এবং ঘরোয়া প্রতিকারের মাধ্যমে গলফারস এলবোর উপসর্গ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। যদি আপনার লক্ষণগুলোর উন্নতি না হয়, আপনার ডাক্তার শেষ অবলম্বন হিসাবে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিতে পারেন। এই সার্জারিটি ওপেন মিডিয়াল এপিকন্ডাইলার রিলিজ হিসাবে পরিচিত। প্রক্রিয়া চলাকালীন, একজন সার্জন আপনার বাহুতে একটি ছেদ তৈরি করেন, টেন্ডনটি কেটে দেন, টেন্ডনের চারপাশে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুগুলো সরিয়ে দেন এবং তারপরে টেন্ডনটি পুনরায় সংযুক্ত করেন।

মিডিয়াল এপিকন্ডাইলাইটিস প্রতিরোধের উপায়:

গলফারের কনুই যে কারোরই হতে পারে, তবে আপনার ঝুঁকি কমাতে এবং এই অবস্থা প্রতিরোধ করার উপায় রয়েছে।

* শারীরিক ক্রিয়াকলাপের আগে স্ট্রেচিং করুন

 ব্যায়াম বা খেলাধুলায় জড়িত হওয়ার আগে, আঘাত রোধ করার জন্য ওয়ার্ম আপ বা মৃদু স্ট্রেচিং করুন। এর মধ্যে আপনার কাজের তীব্রতা বাড়ানোর আগে হালকা হাঁটা বা জগিং অন্তর্ভুক্ত।

* সঠিক ফর্ম অনুশীলন করুন

 অনুপযুক্ত কৌশল বা ফর্ম আপনার কনুই এবং কব্জিতে অতিরিক্ত চাপ দিতে পারে এবং ফলে টেন্ডিনাইটিস হতে পারে। ব্যায়াম এবং খেলাধুলা করার সময় সঠিক কৌশলগুলো শিখতে ক্রীড়া প্রশিক্ষকের বা স্পোর্টস ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক এর সাথে কাজ করুন।

* আপনার হাতকে বিরতি দিন

 আপনি যদি ব্যথার সময় কিছু ক্রিয়াকলাপ বা খেলাধুলা চালিয়ে যান তবে মিডিয়াল এপিকন্ডাইলাইটিস এর উপসর্গের বিকাশ হতে পারে। আঘাত এড়াতে ব্যথা সৃষ্টি করে এমন যেকোনো কার্যকলাপ বন্ধ করুন।

* হাতের শক্তি বাড়ান

আপনার হাতের শক্তি বাড়ানো গলফারস এলবো প্রতিরোধ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে হালকা ওজন তোলা বা টেনিস বল চেপে ধরা ইত্যাদি।

ফিজিওথেরাপি ব্যবস্থাপনা

গলফার এলবো কী ও এর প্রতিকার

গলফার এলবো চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপির প্রধান লক্ষ্য হল ব্যথা উপশম করা এবং প্রদাহ কমানো। এই দুটি জিনিস একটি সঠিক পুনর্বাসন এবং পরে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসতে সাহায্য করবে। তিন ধাপে ফিজিওথেরাপি দেওয়া হয়:

*** ধাপ-১

রোগীকে অবিলম্বে পুনরাবৃত্তিক কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে। সমস্ত ক্রিয়াকলাপ বা খেলাধুলা বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয় না কারণ এটি পেশী অ্যাট্রোফির কারণ হতে পারে।

থেরাপি শুরু হয় পর্যায়ক্রমে প্রতিরোধ/সুরক্ষা, বিশ্রাম, বরফ, সংকোচন, উচ্চতা, ইলেক্ট্রোথেরাপি এবং ওষুধ দিয়ে। আক্রান্ত কনুইতে দিনে কয়েকবার বরফ দেওয়া হয়। এটি স্থানীয় ভ্যাসোকনস্ট্রিকটিভ এবং এনালজেসিক প্রভাব বৃদ্ধি করে। ওষুধের ক্ষেত্রে রোগী ননস্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ খেতে পারেন।

রোগীর অবস্থার উন্নতি না হলে, রাতে ব্যবহারের জন্য স্প্লিন্টিং দেওয়া হয়। এটি সাধারণত কব্জি ফ্লেক্সর গ্রুপের পেশিগুলো যেখান থেকে শুরু হয়, তার চারপাশে দেওয়া হয়, সাথে স্থানীয় কর্টিকোস্টেরয়েড ইনজেকশন ও দেওয়া হয়।

মিডিয়াল এপিকন্ডাইলোপ্যাথির লক্ষণ ও উপসর্গের জন্য ক্রীড়াবিদদের কাউন্টারফোর্স ব্রেসিং এর ব্যবহার বাঞ্ছনীয়। রোগী যখন খেলাধুলায় ফিরে আসে এটি তখনো সাহায্য করতে পারে।

** ধাপ ২

যত তাড়াতাড়ি ফেজ এক এর উন্নতি হয়, তত তাড়াতাড়ি একটি ভাল নির্দেশিত পুনর্বাসন শুরু করা যেতে পারে। দ্বিতীয় পর্বের প্রথম লক্ষ্য হল পূর্ণ, ব্যথাহীন, কব্জি এবং কনুইয়ের গতি পরিসীমা স্থাপন করা। এটি স্ট্রেচিং এবং প্রগ্রেসিভ বা প্রগতিশীল আইসোমেট্রিক ব্যায়াম দ্বারা অনুসরণ করা হয়। ব্যথা কমানোর জন্য এই ব্যায়ামগুলো প্রথমে একটি ফ্লেক্সড কনুই দিয়ে করা উচিত। কিছু অগ্রগতি হওয়ার সাথে সাথে কনুইয়ের বাঁক কমে যেতে পারে। কনুই অঞ্চলের নমনীয়তা এবং শক্তি ফিরে আসার সাথে সাথে পুনর্বাসন প্রোগ্রামে কনসেন্ট্রিক  এবং ইসেনট্রিক রেজিসটিভ এক্সারসাইজ যোগ করা হয়। এই পর্বের চূড়ান্ত অংশ হল খেলাধুলা বা রোগীর পেশার অনুকরণ। এমন একটি প্রমাণ রয়েছে যা রেঞ্জ অব মোশন উন্নত করতে মাসল এনার্জি টেকনিক বা এম-ই-টি-স  ব্যবহারকে সমর্থন করে। এম-ই-টি-স তুলনামূলকভাবে ব্যথা-মুক্ত কৌশল যা সীমিত পরিসরের গতির (রেঞ্জ অব মোশন) জন্য ক্লিনিকাল অনুশীলনে ব্যবহার করা যেতে পারে।

** ধাপ ৩

যখন রোগী তার খেলাধুলায় ফিরে আসতে সক্ষম হয় তখন তার সরঞ্জাম এবং/অথবা কৌশলটি দেখে নেওয়া প্রয়োজন। কার্যক্রমে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করার জন্য এই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

মিডিয়াল এপিকন্ডাইলাইটিস বেদনাদায়ক হতে পারে এবং শারীরিক কার্যকলাপে হস্তক্ষেপ করতে পারে, তবে এটি সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী কোন আঘাত নয়। যত তাড়াতাড়ি আপনি আপনার হাতকে বিশ্রাম দেবেন এবং চিকিৎসা শুরু করবেন, তত তাড়াতাড়ি আপনি রিকোভারি করতে এবং শারীরিক কার্যকলাপ পুনরায় শুরু করতে পারবেন।

তথ্যসূত্রঃ

Dr. M Shahadat Hossain
Follow me
Sep 05, 2021

হাঁটু ব্যথার কারণ কি?

বর্তমানে মাস্কুলোস্কেলেটাল সমস্যাগুলোর মধ্যে হাঁটু ব্যথায় ভুগছেন, এমন রোগীর সংখ্যা অনেক। হাঁটুর…

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This field is required.

This field is required.

16 + 15 =

Call Now