প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ফিজিওথেরাপি. একটি সুস্থ শিশুর জন্ম ও বিকাশ সমাজ এবং জাতির ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করে। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য পরিচর্যা এই দায়িত্বের এক মৌলিক অংশ। একজন শিশুর জীবনের প্রথম ৪০ সপ্তাহ, যা মায়ের গর্ভে কাটে, তার সুস্থতার ভিত্তি স্থাপন করে। জন্মের পরে, শিশু তার প্রথম নিঃশ্বাস নেয় এবং জন্মজাত কান্না তার স্বাস্থ্যের প্রথম লক্ষণ দেয়।

প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ফিজিওথেরাপি

শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ নানা পর্যায়ে ঘটে, যার প্রতিটি ধাপ তার বুঝতে শেখার এবং বাহ্যিক পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে বাড়ায়। শিশু রং এর পরিচয় ও শব্দ প্রতিক্রিয়া থেকে শুরু করে বসা, গড়াগড়ি করা, হামাগুড়ি দেওয়া, দাঁড়ানো এবং হাঁটার কৌশল শিখে। এই বিকাশের প্রতিটি ধাপ শিশুর শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। ফ্রোজেন শোল্ডার ও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা

একটি সুস্থ মায়ের গর্ভাবস্থায় যত্ন, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিচর্যা এবং ডাক্তারের পরামর্শ এই সকল দিক শিশুর ভবিষ্যৎ সুস্থতাকে নির্ধারণ করে। সুস্থ শিশুর জন্ম এবং বিকাশ সমগ্র সমাজ ও জাতির জন্য একটি প্রাণবন্ত ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে।

কি কি কারণে বাচ্চা প্রতিবন্ধি হতে পারে

শিশুর প্রতিবন্ধকতা বিভিন্ন কারণে ঘটতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে:

  • জন্মের পর বাচ্চা যদি কান্না না করে তাহলে তা শিশুর অক্সিজেনের ঘাটতির কারণ হতে পারে।
  • প্রসবের সময় বাচ্চার অস্বাভাবিক অবস্থান, যেমন উল্টো অবস্থানে থাকা, জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
  • জন্মের সময় বাচ্চার মাথায় যদি আঘাত লাগে তাহলে তা মস্তিষ্কের ক্ষতি সাধন করতে পারে।
  • নবজাতকের জন্ডিস সমস্যা মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
  • মা যদি প্রসব বেদনায় দীর্ঘ সময় ভোগেন, তাহলে বাচ্চার অক্সিজেনের অভাব ঘটতে পারে।
  • শিশুর যদি হঠাৎ জ্বর এবং খিচুনি হয় তাহলে মস্তিষ্কের ক্ষতি সম্ভব।
  • শিশুর মাথার আকার যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বড় বা ছোট হয়, তাহলে তা বিভিন্ন সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।
  • গর্ভাবস্থায় মায়ের বড় ধরনের সমস্যা, যেমন উচ্চ রক্তচাপ বা ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, শিশুর স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

উপরোক্ত সমস্ত সমস্যার ফলে শিশুর মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত বা সেরিব্রাল পালসি ঘটতে পারে।

কিভাবে বুঝবেন বাচ্চার মস্তিষ্কে পক্ষাঘাত বা সেরিব্রাল পলসি বা প্রতিবন্ধি 

শিশুর মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত বা সেরিব্রাল পালসি নির্ণয়ের জন্য নিম্নোক্ত লক্ষণগুলি লক্ষ্য করুন:

  • শিশু যদি জন্মের পরে সাধারণ শিশুদের তুলনায় একটু অন্যরকম দেখায়।
  • মুখ দিয়ে অবিরাম লালা পড়া, যা স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণের সমস্যাকে ইঙ্গিত করে।
  • শিশুর হাত ও পা অস্বাভাবিকভাবে শক্ত বা অত্যধিক নরম মনে হওয়া।
  • শিশুর মাথা অস্বাভাবিকভাবে একদিকে বাঁকা হয়ে থাকা।
  • হাত ও পা অস্বাভাবিক রূপে শুকিয়ে গিয়ে শুকনো দেখানো।
  • বাচ্চা যদি স্বাভাবিকভাবে বসতে, হাঁটতে বা চলতে না পারে।
  • কথা বলার ক্ষেত্রে স্পষ্টতার অভাব, কথাবার্তায় অস্বাভাবিকতা।
  • হাঁটার সময় বাচ্চার এক পা অন্য পায়ের সাথে জড়িয়ে যাওয়া (scissoring gait)।
  • হাত ও পায়ের অস্বাভাবিক নাড়াচাড়া বা আকস্মিক মুভমেন্ট (Athetoid CP)।
  • ভারসাম্য বজায় রাখতে অক্ষমতা, যা একটি বড় লক্ষণ।
  • কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চাদের মধ্যে মানসিক, দৃষ্টি বা শ্রবণে প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে।

প্রতিবন্ধি বাচ্চার ফিজিওথেরাপি

সেরিব্রাল পালসি বা প্রতিবন্ধকতা সম্পন্ন বাচ্চাদের জন্য ফিজিওথেরাপি একটি অপরিহার্য চিকিৎসা পদ্ধতি। এই চিকিৎসা বাচ্চাদের শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতাকে হ্রাস করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী। ফিজিওথেরাপির প্রক্রিয়াটি খুব সাবধানতার সাথে পরিচালিত হওয়া উচিত এবং একজন অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অত্যাবশ্যক। মেনিনজাইটিস কী, এর কারণ, প্রকারভেদ এবং গতিবিধি

স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ

স্ট্রেচিং এক্সারসাইজের মাধ্যমে শিশুর হাত ও পায়ের মাংসপেশী এবং জয়েন্টগুলোকে সচল ও নমনীয় করা হয়, যা শিশুকে তার হাত-পা স্বাভাবিক ভাবে নাড়াচাড়া করার সামর্থ্য প্রদান করে। এই ধরনের এক্সারসাইজ সাধারণত একজন ফিজিওথেরাপিস্ট দ্বারা পরিচালিত হয়। এছাড়াও, বিভিন্ন উপকরণ যেমন গেইটার, স্ট্যান্ডিং ফ্রেম, ফিজিওবল ইত্যাদি ব্যবহার করে স্ট্রেচিং করা হয়। যে সকল শিশুর পা জড়িয়ে যায়, তাদের জন্য অ্যাডাক্টর টুলস ব্যবহার করা হয়।

কোয়ার্ডিনেটিং বা প্রপিওসেপটিক এক্সারসাইজ

এই এক্সারসাইজগুলি শিশুর মাংসপেশী ও জয়েন্টের নির্দিষ্ট অবস্থান এবং ভারসাম্য পুনঃপ্রাপ্তির লক্ষ্যে করানো হয়।

ব্যালেন্স বা ভারসাম্য অনুশীলন

ভারসাম্যহীনতা প্রতিবন্ধী বা সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত শিশুদের একটি প্রধান সমস্যা। এর ফলে তারা হাঁটতে ও চলাফেরা করতে কষ্ট পায় এবং প্রায়শই হোচট খেয়ে পড়ে। বাচ্চাকে বসে, দাঁড়িয়ে, স্থির বা চলমান অবস্থায় নানান উপায়ে ভারসাম্যের অনুশীলন করানো যেতে পারে, যা একজন ফিজিওথেরাপিস্টের সহায়তায় সম্পন্ন করা হয়। এই অনুশীলনের মাধ্যমে রোগী স্বনির্ভরভাবে বা সামান্য সহায়তা নিয়ে হাঁটার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। টেনিস এলবো চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি

হাঁটার প্রশিক্ষণ

প্রতিটি সুস্থ শিশু সাধারণত সরাসরি হাঁটা শুরু করে না। তারা বসে, গুটিসুটি মারে, হামাগুড়ি দেয়, এবং শেষে হাঁটতে শেখে। শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের ক্ষেত্রেও এই ধাপগুলি অনুসরণ করা হয়, তবে প্রক্রিয়াটি কিছুটা ধীর হতে পারে বা বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে।

বাড়িতে অভিভাবকরা দুটি দীর্ঘ বাঁশের সাহায্যে শিশুর হাঁটার অনুশীলনে সহায়তা করতে পারেন। যে সকল শিশুদের পা বাঁকা হয়, তাদের জন্য বিশেষ ধরণের জুতা ব্যবহার করা হতে পারে। এখানে একজন দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ ও গাইডলাইন অত্যন্ত প্রয়োজন।

সেরিব্রাল পলসি বা অন্য প্রতিবন্ধকতা থাকা শিশুদের চিকিৎসা করার সময় সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি। তাদের হাত ও পা নাড়াচাড়া করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। বাচ্চাদের অতিরিক্ত জোরে মালিশ করা বা নাড়াচাড়া করা তাদের ক্ষতি করতে পারে। একজন দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্ট এর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেওয়া সর্বোত্তম।

যে সব শিশুদের কথা বলায় সমস্যা আছে, তাদের জন্য স্পিচ থেরাপি প্রয়োজন হয়। এছাড়া, সম্পূর্ণ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শিশুর উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুনর্বাসনের মাধ্যমে, শিশুরা তাদের সর্বোত্তম সম্ভাবনাকে উন্মোচিত করতে পারে এবং বিভিন্ন ধরনের সহায়ক উপকরণ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের সামাজিক, শারীরিক, এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটাতে পারে।

বাংলাদেশে পুনর্বাসন সেবার উন্নয়ন হলেও আরও প্রসারের প্রয়োজন আছে। যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পুনর্বাসন সেবা দিচ্ছে, তাদের সেবাকে আরও ব্যাপক ও সুলভ করা উচিত। একটি সমাজ হিসেবে, এই শিশুদের সহায়তা করা এবং তাদের উন্নতির পথে সহায়ক হওয়া আমাদের দায়িত্ব।

একজন শিশুর প্রতি সদয় মনোভাব এবং সহায়তা তার ভবিষ্যত গড়ে তোলার পথে অপরিসীম ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটি শিশু বিশেষ গুণসম্পন্ন, এবং তাদের প্রত্যেকের মধ্যে অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, যা উপযুক্ত সহায়তা ও পরিচর্যার মাধ্যমে বিকশিত হতে পারে।

তথ্যসূত্র

  1. Panteliadis, C. P., & Hagel, C. (2015). Cerebral Palsy: A Lifelong Challenge Asks for Early Intervention. Open Neurology Journal, 9, 45–52. DOI: 10.2174/1874205X01509010045 https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4503828/
  2. Odding, E., Roebroeck, M.E. and Stam, H.J., 2006. The epidemiology of cerebral palsy: incidence, impairments and risk factors. Disability and rehabilitation, 28(4), pp.183-191. https://www.tandfonline.com/doi/abs/10.1080/09638280500158422
  3. Rosenbaum, P., Paneth, N., Leviton, A., Goldstein, M., Bax, M., Damiano, D., Dan, B. and Jacobsson, B., 2007. A report: the definition and classification of cerebral palsy April 2006. Dev Med Child Neurol Suppl, 109(suppl 109), pp.8-14. https://www.bobathterapistleri.org/resimekleme/Belge/1762019153827457.pdf
  4. Novak, I., Mcintyre, S., Morgan, C., Campbell, L., Dark, L., Morton, N., Stumbles, E., Wilson, S.A. and Goldsmith, S., 2013. A systematic review of interventions for children with cerebral palsy: state of the evidence. Developmental medicine & child neurology, 55(10), pp.885-910. https://onlinelibrary.wiley.com/doi/abs/10.1111/dmcn.12246
Follow me
পরামর্শ নিতে 01877733322