হঠাৎ আঘাত পাওয়া বা শরীরের কোনো একটি অংশে প্রচণ্ড চাপ পড়লে তাকে সাধারণত সফট টিস্যু ইনজুরি বলা হয়। এই ধরনের ইনজুরির প্রধান কিছু লক্ষণ হলো:

ফোলা ভাব: আঘাতপ্রাপ্ত অংশে প্রদাহ বা ফোলা ভাব দেখা দেয়, যা সেই অংশের টিস্যুতে রক্ত ও তরল পদার্থের প্রবাহের ফলে হয়ে থাকে।

প্রচণ্ড ব্যথা: আঘাতপ্রাপ্ত অংশে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়, যা আঘাতের তীব্রতার উপর নির্ভর করে। মাংসপেশি, টেন্ডন, লিগামেন্ট এবং অন্যান্য সফট টিস্যু ইঞ্জুরির কারণে এই ব্যথা হতে পারে।

রঙ পরিবর্তন: আঘাতপ্রাপ্ত স্থান লাল বা নীলাভ হয়ে যায়, যা রক্ত প্রবাহের তারতম্যের কারণে ঘটে।

উষ্ণতা: আঘাতের স্থানটি সাধারণত গরম থাকে, যা প্রদাহজনিত উষ্ণতা থেকে হয়ে থাকে।

এই ধরনের ইনজুরি বিভিন্ন কারণে ঘটতে পারে, যেমন:

  • দুর্ঘটনায় আঘাত: যানবাহন দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো আকস্মিক ঘটনায় শরীরের কোনো অংশে আঘাত পাওয়া।
  • খেলাধুলায় চোট লাগা: খেলাধুলা করার সময় মাংসপেশির টান বা আঘাত পাওয়া।
  • মাংসপেশিতে টান লাগা: হঠাৎ করে মাংসপেশিতে টান লাগা যা সাধারণত অসাবধানতা বা অতিরিক্ত চাপের কারণে ঘটে।
  • পিছলে পড়ে যাওয়া: মসৃণ, স্যাতস্যাতে বা বিপজ্জনক স্থানে পিছলে পড়ে যাওয়া।

এই ধরনের আঘাত যদি অতিরিক্ত তীব্র হয় তাহলে হাড় ভেঙে যেতে পারে বা আরও গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। সেই কারণে, এই ধরনের ইনজুরি হলে অবিলম্বে চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।

আরও পড়ুনঃ ACL (এসিএল) আঘাতের অপারেটিভ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান এবং পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ার

সফট টিস্যু ইনজুরি হলে কি করবেন?

সফট টিস্যু ইনজুরি হলে কি করবেন

প্রথমধাপ

যখন কোনো ব্যক্তির সফট টিস্যু ইনজুরি হয়, তখন তাদের প্রথমে ৬-৭ দিনের জন্য পূর্ণ বিশ্রামে থাকার প্রয়োজন হয়। পূর্ণ বিশ্রামের পরে, চিকিৎসা হিসেবে PRICE পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। PRICE পদ্ধতির প্রতিটি অক্ষর এক একটি বিশেষ চিকিৎসা ধাপকে নির্দেশ করে:

P = Protection (বাধা দেওয়া): আঘাতপ্রাপ্ত স্থানটিতে যাতে আর কোন সমস্যা না হয় কিংবা ব্যথা না লাগে সেভাবে রাখা। এর মাধ্যমে আরও ক্ষতি হওয়া থেকে আক্রান্ত স্থানটি রক্ষা পায়।

R = Rest (বিশ্রাম): আঘাতপ্রাপ্ত অংশটিকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখা, যাতে করে সেই অংশটি দ্রুত সেরে উঠতে পারে।

I = Ice (বরফের সেক): আক্রান্ত অংশে বরফ দেয়া হয়। এর জন্য ভিজে গামছার মধ্যে বরফ নিয়ে সেই অংশে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর্যন্ত প্রয়োগ করা হয়। যদি অতিরিক্ত ঠান্ডা অনুভূত হয়, তাহলে ৩ মিনিট পর উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে আবার ১২-১৪ মিনিট প্রয়োগ করা হয়।

C = Compression (চেপে রাখা): আক্রান্ত অংশে ক্রেপ ব্যান্ডেজ বা অন্য কোন ব্যান্ডেজ দিয়ে পেচিয়ে রাখা হয়। এটি আরও ফুলে যাওয়া প্রতিরোধ করে।

E = Elevation (উঁচু করে রাখা): আক্রান্ত অংশটি হৃদপিণ্ডের বরাবর বা তার চেয়ে উঁচুতে রাখা হয়। এটি ফোলা কমানো এবং রক্ত প্রবাহ উন্নতি করে।

এই সব চিকিৎসা ধাপগুলি প্রয়োগের পাশাপাশি, ব্যথা কমানোর জন্য আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি বা অন্যান্য উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করা হতে পারে। যে কোনো ইনজুরির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এবং পেশাগত চিকিৎসা পরামর্শ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

দ্বিতীয়ধাপ

হঠাৎ আঘাত পেলে কি করবেন

সফট টিস্যু ইনজুরির চিকিৎসার একটি প্রধান ধাপ হচ্ছে রিপেয়ারিং স্টেজ, যা সাধারণত ৭ থেকে ২১ দিন স্থায়ী হয়। এই পর্যায়ে, আঘাত প্রাপ্ত অংশ নিজে নিজে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ায় থাকে। এ সময়ে চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হল আঘাতপ্রাপ্ত অংশের সুস্থতা ও কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা। এ জন্য নিম্নলিখিত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পদ্ধতিগুলি প্রয়োগ করা হয়:

ডিপ ফ্রিকশন টেকনিক: এটি এক ধরনের ম্যানিপুলেশন থেরাপি টেকনিক। এর মাধ্যমে আক্রান্ত স্থানে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং দ্রুত মাংসপেশীর ক্ষত সেরে উঠতে সাহায্য করে।

স্ট্রেচিং: মাংসপেশী ও লিগামেন্টগুলিকে স্ট্রেচ করে তাদের নমনীয়তা বৃদ্ধি করা। এটি মাংসপেশীকে আরও সক্রিয় ও সুস্থ করতে সাহায্য করে।

এক্সারসাইজ থেরাপি: নির্দিষ্ট এক্সারসাইজ ও মুভমেন্ট থেরাপি আঘাতপ্রাপ্ত অংশের স্থিতিশীলতা এবং শক্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

ইলেকট্রোথেরাপি: ব্যথা নিরাময় ও নার্ভ কন্ডাকশন উন্নতি করার জন্য বৈদ্যুতিন স্টিমুলেশন প্রয়োগ করা হয়।

সঠিকভাবে এই চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ না করলে, আঘাতপ্রাপ্ত অংশে মাংসপেশীতে অ্যাডহিশন বা দাগ পড়ে যেতে পারে যা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার কারণ হতে পারে। তাই, রোগীর জন্য নির্দেশিত চিকিৎসা প্রোটোকল অনুসরণ করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

আরও পড়ুনঃ সল্প মেয়াদী ACL (এসিএল) আঘাত সম্পকিত সকল তথ্য

তৃতীয়ধাপ

হঠাৎ আঘাত পেলে কি করবেন

রিমডেলিং ধাপ হল সফট টিস্যু ইনজুরি চিকিৎসার শেষ পর্যায়, যা প্রায় ২১ দিন পর শুরু হয়ে থাকে। এই ধাপের মূল লক্ষ্য হল রোগীকে তার পূর্বের স্বাস্থ্য ও কাজে ফিরিয়ে আনা, এবং আক্রান্ত অংশের পুরো ফাংশনালিটি পুনরুদ্ধার করা। এই পর্যায়ের চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে নিম্নলিখিত প্রক্রিয়াগুলি অন্তর্ভুক্ত থাকে:

স্ট্রেচিং ও স্ট্রেন্থেনিং: ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক আক্রান্ত অংশকে সাবধানে স্ট্রেচিং ও স্ট্রেন্থেনিং এক্সারসাইজ প্রদান করে থাকেন। এই প্রক্রিয়া মাংসপেশীর দৃঢ়তা ও নমনীয়তা বাড়ায়।

ডিপ ফ্রিকশন টেকনিক: এই পর্যায়ে, ডিপ ফ্রিকশন টেকনিক আরও জোরালোভাবে প্রয়োগ করা হয়। এটি আক্রান্ত অংশের রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে তোলে এবং স্কার টিস্যু গঠন রোধ করে।

হিট থেরাপি: কিছু ক্ষেত্রে, হিট থেরাপি বা গরম সেক মাংসপেশীর সংকোচন ও রিল্যাক্সেশনে সাহায্য করে, যা ব্যথা হ্রাস ও চলাফেরার ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি রোগীর আঘাতপ্রাপ্ত অংশকে পূর্ণ স্বাস্থ্যে ফিরিয়ে আনার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। সঠিক ফিজিওথেরাপি ও ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগী আঘাতপ্রাপ্ত অংশের পূর্ণ মোবিলিটি এবং কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার করতে পারেন।

তথ্যসূত্র

  1. Bleakley, C., McDonough, S. and MacAuley, D., 2004. The use of ice in the treatment of acute soft-tissue injury: a systematic review of randomized controlled trials. The American journal of sports medicine, 32(1), pp.251-261. https://journals.sagepub.com/doi/abs/10.1177/0363546503260757
  2. Clarkson, H.M., 2013. Musculoskeletal assessment: joint motion and muscle testing. (No Title). https://cir.nii.ac.jp/crid/1130000797189054976
  3. Hubbard, T.J. and Denegar, C.R., 2004. Does cryotherapy improve outcomes with soft tissue injury?. Journal of athletic training, 39(3), p.278. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC522152/
Follow me
পরামর্শ নিতে 01975451525