fbpx

গর্ভকালীন সময়ে ওজন বৃদ্ধি, হরমোনের পরিবর্তনসহ নানাবিধ কারণে অনেক মহিলাই কোমর ব্যথায় ভুগে থাকেন। অনেকেই এ ব্যাপারে গর্ভবতী হবার আগেই জানেন কিন্তু সি – সেকশনের পর প্রসবোত্তর কোমর ব্যথা সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। এ প্রবন্ধে আমরা এ ব্যাপারে আলোকপাত করবো।

সন্তান জন্মদানের পর পরই অনেক মায়েরাই কোমর ব্যথায় ভুগে থাকেন। এক্ষেত্রে প্রসবের কয়েক ঘন্টার মধ্যে ব্যথা শুরু হয় এবং এর পর কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী ব্যথার   ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

সিজারিয়ান সেকশনের পর কোমর ব্যথার সম্ভাব্য কারণগুলো হলো –

১. হরমোনগত পরিবর্তন

গর্ভাবস্থায় শুধু আপনার পেটের আকারই বাড়ে, এমন না। এর পাশাপাশি নানা ধরণের শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন হয়ে থাকে, যা দৃশ্যগত না কিন্তু বাচ্চা প্রসবের পর কোমর ব্যথায় ভুমিকা রাখতে পারে।

গর্ভাবস্থায়, নারীর শরীরকে প্রসবের জন্য প্রস্তুত করতে রিলাক্সিন নামক হরমোন নিঃসরিত হয়। এই হরমোনের প্রভাবে শরীরের জয়েন্ট এবং লিগামেন্ট কিছুটা আলগা হয়ে যায়, যাতে গর্ভের শিশুকে ধাক্কা দেওয়া সহজ হয়। আপনার স্বাভাবিক প্রসব হোক বা সি সেকশন হোক, আপনার শরীরে এই হরমোন নিঃসরিত হবেই। যেহেতু জয়েন্ট এবং লিগামেন্ট আলগা হলে বায়োমেক্যানিক্যালি আপনার মাজায় চাপ দেওয়া সহজ হয়ে যায়, তাই সামান্যতম কার্যকলাপেও আপনার কোমরে ব্যথা অনুভুত হতে পারে। তবে ভালো খবর হচ্ছে, সন্তান জন্মদানের পরবর্তী কিছু মাসের মধ্যেই আপনার জয়েন্ট, মাংশপেশি এবং লিগামেন্ট ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠে।

২. ওজন বৃদ্ধি

সিজারের পর কোমর ব্যথার অন্যতম কারণ হলো  অতিরিক্ত ওজন বহন। গর্ভাবস্থায় আপনার ওজন বৃদ্ধি পাবে, এটাই স্বাভাবিক। আপনার ভিতরে সম্পুর্ন নতুন একজন মানুষ বেড়ে উঠছে। কিন্তু এই বাড়তি ওজন এর কারণে  আমাদের স্বাভাবিক চলাফেরায় যে ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দু থাকে, তা স্থানান্তরিত হয়ে মেরুদণ্ড ও মাজায় চাপ পড়তে পারে, যার কারণে কোমর এ ব্যথা হতে পারে।

৩. বাচ্চাকে কোলে নেওয়া

আপনার বাচ্চার বয়স মাত্র ছয় থেকে সাত পাউন্ড হতে পারে যা আপাতদৃষ্টিতে খুব বেশি কিছু না কিন্তু আপনার শরীরের জন্য এটি অতিরিক্ত ওজন যা আপনি প্রতিদিন বহন করছেন।

পাশাপাশি,  বাচ্চাকে বিছানা থেকে তুলে কোলে নেওয়ার জন্য আপনাকে ক্রমাগত ঝুঁকতে হচ্ছে। এই কারণে আপনার মেরুদন্ডে চাপ পড়ার ফলে কোমর ব্যথা হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা

৪. বুকের দুধ খাওয়ানো

দীর্ঘসময় ধরে স্তন্যপান করানোর কারণে ঘাড়ে চাপ পড়ে এবং ধীরে ধীরে ঘাড়ে ব্যথার সৃষ্টি করে। এই ব্যথা ঘাড় থেকে কোমরে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যাকে মেডিকেলের ভাষায় “রেডিয়েটিং পেইন” বলে। বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় যদি আপনার পশ্চার ভালো না থাকে, বিশেষ করে যদি আপনার কাঁধ বাচ্চার দিকে ঝুঁকে থাকে, তাহলেও আপনার কোমর ব্যথা হতে পারে।

৫. এনেস্থেশিয়ার প্রভাব

সি - সেকশনের আগে আপনি কোন ধরণের এনেস্থেশিয়া পেয়েছেন, তার উপর ও প্রসব পরবর্তী কোমর ব্যথা হবে কিনা, নির্ভর করে। আপনার অস্ত্রোপচার এর জায়গাটিতে এপিডুরাল বা স্পাইনাল ব্লক দেওয়া হতে পারে।

এপিডুরাল ক্যাটাগরিতে, ডাক্তার আপনার মেরুদন্ডের আশেপাশের জায়গায় এনেস্থেশিয়া ইনজেকশন দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে, স্পাইনাল ব্লকে, মেরুদন্ডের খুব কাছে এনেস্থেশিয়া ইনজেকশন দেওয়া হয়। স্পাইনাল ব্লক খুব দ্রুত কাজ করে। এপিডুরাল এর কার্যকারিতা শুরু হতে ২০ মিনিটের মতো লাগে। কোন ক্যাটাগরির এনেস্থেশিয়া ব্যবহার করা হয়েছিলো, তা প্রসব পদ্ধতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।

এপিডুরাল বা স্পাইনাল ব্লক ব্যবহার করার একটি জটিলতা হলো, প্রসবের পর তারা মেরুদন্ডের কাছাকাছি অবস্থিত মাংশপেশিকে শক্ত করে ফেলতে পারে (স্পাজম)। মাংশপেশির এর অস্বাভাবিকতা প্রসবের পর কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী চলতে থাকে, যার কারণে কোমর ব্যথা সহ অন্যান্য জায়গাতেও ব্যথা অনুভুত হতে পারে।

সিজারের পর কোমর ব্যথায় আপনি কি করতে পারেন?

সিজারের পর কোমর ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে আপনি যা যা করতে পারেন:

  • আপনার বাচ্চাকে কোলে তোলার সময় ঝুঁকবেন না

আপনার অঙ্গভঙ্গি সম্পর্কে সচেতন হন। আপনার পিঠ সোজা রাখুন। আপনার অসুবিধা হলে বাচ্চাকে কোলে থেকে নামিয়ে বিছানায় বা সমতলে রাখতে অন্য কারো সাহায্য নিন।

  • স্তন্যপানের সময় আপনার পিঠ সোজা রাখুন

এর ফলে আপনার ঘাড় ও মেরুদন্ডে চাপ প্রশমিত হয়। যার কারণে কোমর ব্যথা প্রতিহত হয় এবং ব্যথা থাকলেও তা কম অনুভুত হয়। স্তন্যপানের জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজে বের করুন।

  • গরম পানিতে গোসল করুন

হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করলে মাংশপেশির টান বা শক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে যে ব্যথা অনুভুত হয়, তা খানিকটা কমে যায়। আর্দ্র তাপ রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয়, যার কারণে প্রদাহের সাথে সাথে ব্যথাও কমে। যেহেতু সি- সেকশন একটি বড়সড় সার্জারি, তাই যতক্ষণ না পর্যন্ত ডাক্তারের অনুমতি না আসে, ততক্ষণ পর্যন্ত গোসল করা যাবে না। তবে কোমরে হিটিং প্যাড ব্যবহার করা যেতে পারে।

  • বিশ্রাম নিন

সি-সেকশনের পর খুব বেশি চলাফেরা করলে কোমর ব্যথা আরো বেড়ে যেতে পারে। নিজেকে বিশ্রাম করার সুযোগ দিন। যখনই সময় পাবেন, একটু ঘুমিয়ে নিন। ঘুমের মধ্যেই শরীর নিজেকে মেরামতের সুযোগ পায়। সদ্য জন্মানো বাচ্চার দেখভাল করতে যেয়ে অধিকাংশ সময়েই মায়েরা পর্যাপ্ত ঘুমানোর সুযোগ পান না।

  • হালকা ব্যায়াম শুরু করুন

প্রসব পরবর্তী কর্মঠ জীবন ব্যথা দূর করতে অনেকাংশে সাহায্য করে। ইয়োগা, পিলাটিস, মাঝারি গতিতে হাঁটা আপনার পেটের পেশিকে শক্তিশালী করে এবং কোমরের টান ছেটে দেয়।  এখানে আমরা অল্প কিছু ব্যায়াম সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছি, যা আপনি কোন ধরণের সরঞ্জাম ছাড়াই যে কোন জায়গায় করতে পারবেন।

১. বেলি ব্রিদিং

এটি একটি চমৎকার রিলাক্সেশন টেকনিক। এই শিথিলকরণ কৌশলটি আপনার কোর মাসল গুলোকে একসাথে কাজ করতে পুনরায় প্রশিক্ষণ দেয়। এই ব্যায়ামটি করার সময় ট্রান্সভার্স এবডোমিনিস মাসল এর ব্যায়াম হয়।

ধাপ ১ - বিছানা বা সোফায় শুয়ে পড়ুন

ধাপ ২– আপনার হাত পেটের উপর রেখে শরীর শিথিল করুন।

ধাপ ৩ - নাক দিয়ে গভীর শ্বাস নিন, আপনার পেট যে শ্বাস নেওয়ায় সাথে সাথে প্রসারিত হচ্ছে, তা অনুভব করুন।

ধাপ ৪মুখ দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। শ্বাস ছাড়ার সময়, আপনার নাভিকে মেরুদন্ডের দিকে টানুন, সাথে আপনার পেটের পেশিগুলোকেও সংকুচিত করুন। ৩ সেকেন্ড ধরে রাখুন।

দিনে ৩ বার ৫ থেকে ১০ বার করুন।

২. সিটেড ক্রেগেল

গবেষনায় দেখা গেছে, প্রসবোত্তর পেলভিক ফ্লোর পেশিকে সক্রিয় করতে ক্রেগেল এক্সারসাইজ অসাধারণ কাজ করে। সি-সেকশনের পরে আপনার ইউরিনারি ক্যাথেটার থাকতে পারে। ক্যাথেটার অপসারণের পরে এই ব্যায়ামটি করবেন।

ধাপ ১- মেঝেতে পা রেখে চেয়ারে বসুন। 

ধাপ ২– পেটের (পেলভিক ফ্লোরের) পেশিগুলোকে সংকুচিত করুন। প্রস্রাব আটকে রাখার চেষ্টা করছেন, এমন ভাবে করুন।

ধাপ ৩- যতক্ষণ সম্ভব, এই সংকোচনকে ধরে রাখুন। ৫ সেকেন্ড দিয়ে শুরু করুন এবং ধীরে ধীরে সময় বাড়িয়ে দিন। 

ধাপ ৪গভীর শ্বাস নিন, তারপর শ্বাস ছাড়ুন। সংকোচনকে শিথিল করুন। 

 * দাঁড়িয়ে এবং শুয়েও ক্রেগেল এক্সারসাইজ করুন। প্রতিবার ২ মিনিটের বিরতিতে ৮-১২ বার এই ব্যায়ামটি করুন, দিনে দুইবার।

৩. ওয়াল সিট ( দেয়ালে বসা)

এই চমৎকার ব্যায়ামটি করলে একই সাথে কোয়াড্রিসেপস, হ্যামস্ট্রিং, পেলভিক ফ্লোর, কোর এবং পিঠের নিচের অংশের ( লোয়ার ব্যাক) মাসল গ্রুপের একসাথে কাজ হয়।

ধাপ ১– দেয়াল থেকে ১ - ২ ফুট দূরে সোজা হয়ে দাঁড়ান।

ধাপ ২- ধীরে ধীরে দেয়ালের দিকে ঝুঁকুন, নিজেকে বসার অবস্থানে নামিয়ে নিন। আপনার হিপ ও হাঁটু একে অপরের ৯০ ডিগ্রীতে থাকতে হবে। 

ধাপ ৩গভীর শ্বাস নিন। শ্বাস ছাড়ার সময় ভাবুন, আপনি দেয়ালের দিকে আপনার নাভিকে টেনে নিচ্ছেন।

ধাপ ৪এই অবস্থানে পেটের পেশিগুলোকে সংকুচিত করে ক্রেগেল ব্যায়ামটি করতে পারেন।

যতক্ষণ সম্ভব ধরে রাখুন। ১ মিনিট বিরতি নিন। ৫ বার পুনরাবৃত্তি করুন।

আপনার শারীরিক গঠন ও অবস্থা অনুযায়ী কোমর ব্যথা দূর করতে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট নানাভাবে সাহায্য করতে পারেন। তাই সিজারের পর কোমর ব্যথায় ভুগলে আজই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক এর শরণাপন্ন হোন।

Dr. Sapia Akter

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This field is required.

This field is required.

2 × two =

Call Now